01/09/2024
পশ্চিমবাংলায় হেলথকেয়ার মাফিয়ার মার্কেট সাইজ, মানে টাকার দিক থেকে, কত হতে পারে তার একটা ছোট্ট স্নিপেট বা আন্দাজ কিছুদিন আগে পেলাম। আমি প্রথমে ঘটনাটা বলছি আর তারপর সেটার পেছনের অঙ্ক বা সমীকরণটা বোঝানোর চেষ্টা করছি।
মাসখানেক আগে। আমাদের অফিসে একজন বন্ধুর এক আত্মীয়কে হঠাৎ হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার হয়ে পড়ে। তিনি SSKM এ যোগাযোগ করেন এবং যথারীতি তাকে পত্রপাঠ বলে দেওয়া হয় যে হাসপাতালে বেড খালি নেই। তখন সেই বন্ধু আমাদের অফিসেরই আরেকজন দাদা, যার ছেলে সেখানে ডাক্তারি পড়ছে, তাকে ধরেন, যদি ছেলের সূত্রে একটা বেড জোগাড় করা যায়। ছেলে তার লেভেলে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছু লাভ হয় না। বেড পাওয়া যায় না। তারপর পরের দিন অফিসে যখন সেই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, শেষমেশ তাহলে ভর্তি করানোর কি হলো? তিনি জানান যে, হ্যাঁ, অবশেষে বেড পাওয়া গেছে। ওই হাসপাতাল চত্বরেই এক দালাল, ক্যাশ 35,000 টাকা নিয়ে খুব সহজেই নাকি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এবং এটাও বলেছে যে এর পর আর কিছু দরকার হলে তাকে ফোন করলেই সে যাবতীয় ব্যাবস্থাপাতি করে দেবে।
এই হচ্ছে ঘটনা। খুব নতুন কিছু না, আমরা সবাই-ই এসব জিনিষ আগে, কোথাও না কোথাও দেখেইছি, কিন্তু এসবের পেছনের বৃহত্তর সমীকরণটা অত খতিয়ে দেখি নি। ভেবে দেখি নি। যেটা এখন দেখার সময় এসেছে।
SSKM হাসপাতালে এমার্জেন্সী নিয়ে মোট বেডের সংখ্যা 1775*। যদি ধরে নেওয়া হয় যে এই 1775 টা বেডের 10% হাসপাতাল মাফিয়াদের হাতে রয়েছে, তাহলে হয় 178 টা বেড। এবার একটা বেডে, একজন পেশেন্ট, গড়ে তিনদিন করে থাকলে, মাসে একেকটা বেড থেকে দশবার (30÷3 =10) করে টাকা তোলা যায়। একবারের তোলাবাজি 35,000 টাকা। তাহলে একমাসে, এই বেড কালোবাজারি থেকে মোট আয় দাঁড়াচ্ছে;
Rs. 35,000 x 170 x 10 = 6.21 কোটি টাকা। অর্থাৎ, বছরে 74.55 কোটি টাকা!... এটা শুধু SSKM হাসপাতালে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, সরকারী হিসেব অনুসারে, SSKM এর এক বছরের এন্ডাওমেন্ট বাজেট, অর্থাৎ চালানোর খরচ 720.36 কোটি টাকা।
আচ্ছা, এবার একটু জুম-আউট করে পুরো রাজ্যের বৃহত্তর দৃশ্যটা দেখলে সেটা কিরকম দাঁড়ায়? পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে, ছোট-বড় মিলিয়ে মোট সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা 1510*। এর মধ্যে কলকাতায় রয়েছে 44* টা, যার মোট বেড সংখ্যা 9,160*। এবার এই 44 টা হাসপাতালের সবকটাই যেহেতু সেরকম বড় বা ব্যাস্ত নয়, তাই বেডের রেটও সবজায়গায় নিশ্চয় এক হবে না। কোথাও বেশী হবে আবার কোথাও কম। গড়ে ধরে নেওয়া যাক, 20,000 টাকা। তাহলে খালি কলকাতা শহরে, সরকারী হাসপাতালে, শুধুমাত্র বেডমাফিয়া সেক্টরের ভ্যালু দাঁড়াচ্ছে,
Rs. 20,000 x (9,160 X 10%) x 10 = 18.32 কোটি টাকা মাসে। অর্থাৎ, বছরে 219.84 কোটি টাকা!
দুশো কুড়ি কোটি টাকা।
এবার এই অঙ্কটাকে মোটামুটিভাবে আনুপাতিক ধরে, এর সঙ্গে ওষুধ, স্যালাইন, রক্ত, অ্যাম্বুলেন্স, মর্গ, পোস্ট-মর্টেম, কনজিউমেবল্স থেকে শুরু করে বাংলাদেশী পেশেন্ট পার্টির পকেট কাটা, ইনফ্রাস্ট্রাকচার -টেন্ডার স্ক্যাম, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল র্যাকেট এবং সর্বোপরি সবচেয়ে বেশী পয়সা যাতে, চোরা অর্গান ট্রাফিকিং যোগ করলে, খালি কলকাতা শহরে হেলথ কেয়ার মাফিয়া ইন্ডাস্ট্রির সাইজ অন্তত 1,200 থেকে 1,500 কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে আমার ধারণা। বছরে। খালি 44 টা হাসপাতালের। এখন কলকাতার বাইরে হাসপাতালগুলোর, মানে বাকি 1466 টা হাসপাতালের, মাফিয়া বিজনেস পোটেনশিয়াল যদি কলকাতার 30% ও ধরা যায়, তাহলে রাজ্যস্তরে এই অঙ্কটা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে 20,590 হাজার কোটি টাকায়।
আমার কাছে এক্ষুনি তেমন সেরকম কোনো ডেটা নেই, কিন্তু ধারণা করা যায় যে, আজকের দিনে আমাদের রাজ্যে, বিভিন্ন সেক্টর মিলিয়ে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সরকার অনুশাসিত অর্গানাইজড ক্রাইম বা মাফিয়া ইন্ডাস্ট্রির সাইজ কিছু না হলেও 60,000 থেকে 75,000 কোটি টাকার কাছাকাছি হবে। এখানে একটা আইডিয়া দেওয়ার জন্যে বলে রাখি যে, আজ থেকে তিন বছর আগে, যখন অনুপ মাঝি আর অভিষেক কয়লাকান্ডে ধরা পড়ে, তখন পশ্চিমবঙ্গে খালি কয়লা মাফিয়া ইন্ডাস্ট্রিরই এস্টিমেটেড ভ্যালু ছিলো 20,000* হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়াও বালি, শিক্ষা, জমি, বন্দর বা কন্সট্রাকশন সিন্ডিকেটের মতো আরও একশোখানা মাফিয়া চক্র রয়েছে যার খবর আমার আপনার মতো লোক অবধি পৌঁছয়ই না...আর এই পুরো মাফিয়া ইন্ডাস্ট্রি, পশ্চিমবঙ্গের ইকোনমির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, নাহলে পশ্চিমবাংলার মতো একটা রাজ্য, যার চলতি বছরে বাজেট ঘাটতি হচ্ছে 68,250 কোটি টাকা...যে রাজ্যের গড় মাথাপিছু আয়, ন্যাশনাল অ্যাভারেজের চেয়ে 30,000 টাকা কম...যে রাজ্যের আনএমপ্লয়মেন্ট রেট ন্যাশনাল অ্যাভারেজের চেয়ে 6% ওপরে...যে রাজ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের গ্রোথ, ন্যাশনাল অ্যাভারেজের আদ্ধেক...মাথা পিছু জিডিপির হিসেবে যে রাজ্য দেশের 24 নাম্বারে আসে...পভার্টি ইনডেক্সের নিরিখে যে রাজ্য, দেশের প্রথম 15 টা রাজ্যের মধ্যে পড়ে...NSO রিপোর্টের হিসেবে, গত সাত বছরে যে রাজ্য থেকে তিরিশ লাখ চাকরী অন্য রাজ্যে চলে গেছে... সে রাজ্য কি করে দিনের পর দিনের ধরে লক্ষীর ভান্ডারের মত, যার কিনা একারই 2024-25 সালের বাজেট 14,400 কোটি, খরচসাপেক্ষ সব স্কীম চালিয়ে যেতে পারে!? সে রাজ্য কোথা থেকে এত এত দুর্গাপুজোর ক্লাবঅনুদান দেয়?! কোথা থেকে আসে ইমামভাতার 700 কোটি? বা তপশীলি বন্ধু আর জয় জহর প্রকল্পের 7,000 কোটি? বা ঐক্যশ্রীর 600 কোটি টাকা?
কোথা থেকে আসে দিদিভাই, আসে কোথা থেকে!?
কি? চোখের সামনে একটা নকশা ভেসে ভেসে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে? আর ক'দিন দাঁড়ান, এরপর পুরোটা একদম পরিষ্কার দেখতে পাবেন। কেঁচো খুঁড়তে কালনাগিনী বেরোলো বলে, তার ফণার ওপরটা নীল রঙের আর ল্যাজের কাছটা সাদা!
_______________________
*তথ্যঋণ :
https://www.wbhealth.gov.in
https://www.ceicdata.com/en/india
https://www.moneycontrol.com/news/business/coal-blooded-dons-the-rise-and-fall-of-anup-majhi-and-joydeb-mondal-6156701.html
Https:// Wikipedia.org
https://prsindia.org/budgets/states/west-bengal-budget-analysis-2024-25