03/08/2024
ছয় সমন্বয়কের প্রতি খোলা চিঠি..
৬৯ এ পাকিস্তান সরকার ইন্ডিয়াকে সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত ছিল, বাঙ্গালীদের নিয়ে অতটাও কনসার্ন ছিল না, 'সময় মতো এদেরকে চাপ দিয়ে দমিয়ে ফেলা যাবে' টাইপ মনোভাব রাখতো। ঠিক এই জায়গায় বর্তমান সরকারের মনোভাবের মিল পাওয়া যায়। ৬৯ এর সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা হচ্ছে; ৬৯ এ শাসকগোষ্ঠী আমাদের থেকে ২ হাজার মাইল দূরে অবস্থান করতো, পূর্ব পাকিস্তান স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল এবং বলতে গেলে আমরা তাদের উপর কোনোভাবেই নির্ভরশীল ছিলাম না। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী যারা ছিল, তারাও প্রায় সবাই আমাদের পক্ষেই ছিল।
বর্তমান সরকারের হাত পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপনার নিকটবর্তী থানা হয়ে আপনার গলা পর্যন্ত প্রসারিত, রাতের আঁধারে চেপে ধরতে দেরি করবে না। গত ১৫ বছরে সরকার তার কর্মচারীদের এত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে যে, চাকরি ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়া তো দূরের থাক, সরকারের বিরোধিতা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোষ্ট দেয়ার জন্য ১০% লোকও আপনি খুঁজে পাবেন না।
৭১ এর সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটের বিস্তর ফারাক। ৭১ এ আমাদের আর্মি, আমাদের পুলিশ এবং ই পি আর এর একটা বড়ো অংশ সরকারের বিরোধিতা করে আমাদের পক্ষে চলে এসেছিল। তাদের মাধ্যমে প্রাথমিক ট্রেইনিং এবং প্রতিরোধ গড়ার জন্য অস্ত্রও পেয়ে যাই। পাকিস্তানপন্থিদের সংখ্যা তখন ১% এর নিচে ছিল। সাধারণ জনগণ আত্মরক্ষার জন্য ভারতে আশ্রয় নিতে পেরেছিল। ভারত লার্জ স্কেলে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেছিলো। অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রথমে ভারতে পালিয়ে গিয়ে ট্রেনিং এবং অস্ত্র নিয়ে পুনরায় সংগঠিত হয়ে ফিরে এসে আবার যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। ভারতের স্বার্থ ছিল দেখেই ভারত সাহায্য করেছে। স্বার্থ যা'ই থাক, তখন ভারত মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলে হয়তো যুদ্ধের ফলাফল অন্যকিছু হতো।
বর্তমান সরকারের তুলনায় এরশাদ নিতান্তই ভদ্রলোক ছিল, তাই ৯০ তে রক্তপাত এত দীর্ঘ হয়নি, অল্পতেই হার মেনে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল।
এই সরকার গনতন্ত্রের লেবাসে যে স্বৈরাচারী আচরণ করছে, তাতে বোঝাই যাচ্ছে তারা এতো সহজে ক্ষমতা থেকে যাবে না। এইজন্য আপনি আরেকটা মুক্তিযুদ্ধ করতে চান? সাহায্যকারী দেশ কোনটা? আপনার ট্রেনিং কে দিবে? অস্ত্র কই পাবেন? সরকারি পুলিশ-বিজিবি তো আছেই, আর্মিও সরকারের পক্ষে থেকে মানুষ মারতে দ্বিধাবোধ করবে না। সরকারি হেলমেট বাহিনী সহ দলের সুবিধাভোগী দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ নিজের অবস্থান ধরে রাখতে আপনার মাথা ফাটানোর সময় দ্বিতীয়বার ভাববে না- তাদের কিভাবে সামাল দিবেন? এটা তখন আর মুক্তিযুদ্ধ থাকবে না, একটা ভয়ংকর গৃহযুদ্ধে পরিনত হবে! লাঠিসোঁটা নিয়ে মেশিনগানের সামনে কতক্ষণ টিকে থাকবেন?
বহির্বিশ্বের দিকে তাকিয়ে লাভ নাই। জাতিসংঘ আমাদের দুদকের মতো একটা দাঁত ছাড়া বাঘ, আজ পর্যন্ত মিডল-ইস্টের একটা সমস্যাও সমাধান করতে পারেনি। আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়বো, ভারত পারলে তাদের পক্ষ নিয়ে আমাদেরই মারতে আসবে। আমেরিকার দিকে তাকিয়েও লাভ নেই, তারা শুধু মুখেই হুমকি ধামকি দিবে, বাস্তবে কিছুই করবে না। তার জ্বলন্ত প্রমাণ- মায়ানমার। মায়ানমার চেষ্টা করবে এই সুযোগে আরও কিছু রোহিঙ্গা পুশ-ইন করতে। রাশিয়া নিজের ঘরের যুদ্ধ সামলাতেই হয়রান, ভারতকে নারাজ করে এত দূরে এক দেশে হস্তক্ষেপ করবে না। চীন নিজেদের কলোনিয়াল স্টেট আর বর্ডার ছাড়া অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিবে। ব্যাস, এই পর্যন্তই বহির্বিশ্ব থেকে আমাদের প্রাপ্তি।
সব ধরনের আন্দোলনের একটা পিক টাইম থাকে, যখন শাসকগোষ্ঠী প্রথমে ট্যাক্টিক্যালি ডিল করতে ব্যর্থ হয় এবং অতিমাত্রায় চাপ প্রয়োগ করে আন্দোলন আরও উস্কে দেয়, তখন তারা মোরালি কিছুটা দূর্বল থাকে, চাইলে যেকোনো দাবি আদায় করে নেয়া সম্ভব।
কিন্তু, যার বা যাদের কাছে আপনি দাবি করছেন, তাকেই যদি সরে যাওয়ার দাবি জানান, তখন তাদের আর হারানোর কিছু থাকে না। একজন মানুষ বা একটা গোষ্ঠী ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার সাথে নেগোসিয়েশন করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তার অস্তিত্ব ধরে টান না দেন। যখন আপনি তার অস্তিত্বই মানতে চাইছেন না, তখন তাদের কাছে লজিক্যালি নেগোসিয়েশনে বসার কোনো লজিক থাকে না।
যেহেতু আপনার সাথে আলোচনার টেবিলে বসে তাদের এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো রাস্তা তৈরী হচ্ছে না, সেহেতু আপনি-আমি তাদের কাছে আরও মূল্যহীন হয়ে পড়বো। এখন আমাদের দমাতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে, সেটার পরিনতি যতই ভয়াবহ হউক!
বর্তমানে আন্দোলন যে গতিতে চলছে, তাতে সরকার যথেষ্ট চাপে আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, আপনি মানেন বা না মানেন- এই চাপ সরকার উৎখাত করার জন্য খুবই সামান্য! গত কয়েকদিনের আন্দোলনে সরকার নিজের জায়গা থেকে একটু নড়েছে ঠিকই, কিন্তু নড়েছে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যই। এই চাপ আর বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না, একসময় ভেঙ্গে পড়বে। সরকার না, অর্থনীতি এবং সাপ্লাই চেইন ভেঙ্গে পরবে, সেই সঙ্গে ভেঙ্গে পরবে আন্দোলনের দৃঢ়তাও। যার মাশুল প্রতিটা নাগরিককেই দিতে হবে।
অতীতের অন্য যেকোনো সরকার হলে একটা আশা ছিল, কিন্তু এই সরকার ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য হোক কিংবা নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্য হোক, দেশকে ধ্বংস করে দিয়ে হলেও তারা ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। এরা একজন আরেকজনের উপর নির্ভরশীল। দূর্নীতিবাজ মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে পুলিশ-প্রশাসন, কেন্দ্রীয় নেতা থেকে এলাকার পাতি মাস্তান পর্যন্ত কেউ চাইবে না তাদের এতদিনের গড়া স্বর্গরাজ্য ভেঙে যাক। সবাই যার যার অবস্থান থেকে একজোট হয়ে রক্তের হোলি খেলবে।
আমাকে যতখুশি গালি দেন, কাপুরুষ বলেন, সরকারের দালাল বলেন, তবুও করজোড়ে মিনতি করি- আলোচনায় বসেন, প্লিজ বসেন! এই আন্দোলন এবং আপনাদের প্রতি পূর্ণ সসমর্থন ব্যাক্ত করেই বলছি, আমার ভাই-বোন এবং সন্তানদের লাশের উপর দিয়ে আলোচনায় বসতে গিয়ে নিজের বিবেকের কাছে অনেক ছোটো হতে হবে, কিন্তু আমার আরও ভাই-বোন কে লাশ হওয়া থেকে বাঁচাতে এই কঠিন পদক্ষেপটা আপনাদের নিতেই হবে। আলোচনায় বসা মানেই আমরা হেরে যাইনি। ৭০ বছর ধরে চলা শত্রুতা বুকে নিয়েই আমেরিকা-রাশিয়া এক টেবিলে বসে, হাত মেলায়। ইজ্রায়েল ফিলিস্তিনে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরেও আলোচনার রাস্তা বন্ধ করে না।
আপনারা আমার থেকে অনেক বিজ্ঞ, দেশের ভবিষ্যৎ, আপনাদের জ্ঞান দেয়ার মতো সামর্থ্য আমার নাই। তারপরেও আমার ক্ষুদ্র জ্ঞ্যানে কিছু পরামর্শ ঘুরপাক খাচ্ছে, সেগুলো শেয়ার না করলে নিজের অস্থিরতা কমবে না।
যদি আলোচনায় বসেন, প্রতিটি আহত এবং শহীদ ভাই-বোনদের ভিডিও ফুটেজ ধরে ধরে দ্বায়ী ব্যক্তির শাস্তি দাবি করেন। যেসব মন্ত্রী, সচিব, উপদেষ্টা, পুলিশ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা ছাত্রদের আন্দোলন, মৃত্যু এবং গ্রেফতার হওয়ার ব্যপারে তাচ্ছিল্য করে কথা বলেছে, মিথ্যা কথা বলেছে- তাদের অপসারন দাবি করেন। ক্যাম্পাসে দলভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান। আপনারা ৬ সমন্বয়ক তো থাকবেন'ই, সাথে কোনো দলের ট্যাগ নাই এমন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে রাখার অনুরোধ করছি।
১। শিক্ষক হিসেবে ড. আসিফ নজরুল।
২। আইনজীবী হিসেবে আ্যডভোকেড জেড আই খান পান্না।
৩। সাংবাদিক হিসেবে মানজুর আল মতিন।
৪। সমাজকর্মী হিসেবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
আমি জানিনা আমার এই পোষ্টের কারণে কার কার রোষানলে পরতে হবে, হয়তো দুই পক্ষই গালি দিবে, আ্যরেস্টও হতে পারি, তারপরেও নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিতে পারবো যে, আরও কিছু মানুষের জীবন বাঁচাতে আমার অবস্থান থেকে আমি এই চেষ্টাটুকু করেছি।
দেশ এবং দেশের মানুষের ভার আপনাদের হাতেই রইলো। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন... ♥️
© স্বশিক্ষিত ভদ্রলোক
০৩-০৮-২০২৪ খৃঃ।