10/10/2026
তাজমিনকে হত্যা করে পুকুরে গোসল, আইফোন লুকিয়ে চট্টগ্রামে পালান সুমন!
একটি কিশোরী রাতে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় উঠেছিল। চালককে ১০০ টাকা দিয়ে রুটি ও কলা কিনে দিয়েছিল। হয়তো ভেবেছিল, রাতের এই যাত্রায় চালকও একটু সহযোগিতা করবেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ যাত্রা।
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমীনের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক ভয়াবহ বর্ণনা। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তবে ধর্ষণের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাইয়ের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, গত ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ ছিল কিশোরীটি।
ঘটনার রাতে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে বাড়ি ফেরার জন্য সুমনের অটোরিকশায় উঠেছিল তাজমীন। ৫০০ টাকা ভাড়া চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকায় যাওয়ার কথা হয়। পথে চালকের জন্য ১০০ টাকা দিয়ে রুটি ও কলাও কিনে দেয় সে।
কিন্তু বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার বদলে চালক অটোরিকশার গতিপথ পরিবর্তন করে নির্জন এলাকায় নিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে বিপদের আশঙ্কা করে তাজমীন পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটকে রাখা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া বর্ণনা অনুসারে, কিশোরীটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ধানক্ষেতে নিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
এরপর যা ঘটেছে, তা অপরাধের ভয়াবহতার পাশাপাশি অপরাধীর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টারও চিত্র তুলে ধরে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেন সুমন। ঘটনাস্থলে অটোরিকশা রেখে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করেন তিনি। পরে অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় গিয়ে একটি জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান।
তবে তদন্তকারীদের কাছে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় তথ্য। চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদের জঙ্গল থেকে আইফোন এবং ঘটনাস্থল থেকে তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তাজমীনের বাবার কাছে পাঠানো লাইভ লোকেশনও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবার সঙ্গে লাইভ লোকেশন শেয়ার করেছিল। কিন্তু বাবা তাৎক্ষণিকভাবে সেটি দেখতে পাননি। পরে ভোরের দিকে লোকেশন দেখে মেয়েকে খুঁজতে বের হন তিনি।
এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশায় বসে থাকতে দেখা গেছে। অটোরিকশায় অন্য কেউ ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত চালক সুমন ছাড়া অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ।
তদন্তের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাজমীন ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ থাকলেও পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই সময় সে কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল কিংবা কেউ তাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়।
একজন কিশোরী বাড়ি ফেরার পথে কতটা নিরাপদ? গণপরিবহন বা ভাড়ায়চালিত যানবাহনে ওঠার আগে চালকের পরিচয় ও যানবাহনের তথ্য নিশ্চিত করার সুযোগ কতটা আছে? আর কোনো শিশু বা কিশোরী নিখোঁজ হলে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পরিবার, স্থানীয় মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা কতটা কার্যকর হতে পারে? মা বাবার সতর্কতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে মনে রাখতে হবে, কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব বা পরিবারের কোনো সিদ্ধান্তের কারণে অপরাধীর দায় কমে যায় না। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। আর অপরাধের দায় অপরাধীরই।
একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার পর আমরা যেন শুধু কয়েক দিন ক্ষোভ প্রকাশ করেই থেমে না যাই। তাজমীনের মৃত্যু আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিক।