08/06/2025
আলাদা হয়ে যাবার জন্য ভেতরে ভেতরে বাসা খুঁজছিলাম দুজন মিলে। কাউকে কিছু না জানিয়ে বাসাটা ঠিক ও করে ফেললাম। আসলে বিয়ের পর আমি আমার বর আর শাশুড়ি একসাথে থাকাটা আমার প্রথম প্রথম খারাপ লাগেনি। আমার মা নেই, তাই শাশুড়ি কেই মা এর জায়গা দিতে চেয়েছিলাম।তিন জনের সংসার ভালই চলছিল। বছর খানিক যেতে না যেতেই ঝামেলা শুরু। আমার অভিযোগের যেমন শেষ নেই, আমার শাশুড়ির ও অভিযোগের শেষ নেই। এর উপরে আমার বরের অতিরিক্ত মেজাজ। ত্রিমুখী সংঘর্ষে আমরা সবাই বিরক্ত।
আমরা তিনজনই কর্মজীবী। যতক্ষণ বাইরে থাকি ততক্ষন ভালো। বাসায় ফিরলেই ঝগড়াঝাটি চিল্লাপাল্লা। আমার আর আমার বর মিজানের সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। তাই সব কিছু চিন্তা ভাবনা করেই আলাদা হবার পরিকল্পনা করলাম।
এক কন কনে শীতের সকালে আমরা দুজন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আমাদের জিনিসপত্র নতুন বাসায় উঠিয়ে ফেললাম। যাকে ফেলে আসলাম অফিসে থাকায় তিনি টের ও পেলেন না। টের পাবেন অফিস থেকে ফিরে। টের পেলে কি দারুণ ব্যাপার হবে সেটা ভেবেই আমরা দুজন উচ্ছ্বসিত।
নতুন বাসায় সব কিছু গোছাতে গোছাতে বিকেল হয়ে গেলো৷ আমরা বিকেলের চা খেতে খেতে অপেক্ষা করছি কাংখিত ফোনের। আমি চা খেতে খেতে বললাম,
" আম্মা, আপনার ছেলের অফিস ছুটি হয় চারটায়। বাসায় ফিরে পাঁচটায়। এখন বাজে পাঁচটা পাঁচ। ফোন করেনা কেন?"
আমার শাশুড়ি হাসতে হাসতে বললেন,
" শান্ত হও মুক্তা, আসবে আসবে। আইসা যখন দেখবে পুরা বাড়িতে শুধু একটা চেয়ার, তখন ভ্যাবাচ্যাকা খাবে। ভ্যাবাচেকা খাইতে সময় লাগবে। "
আমি আর আমার শাশুড়ি আমাদের কেনা জিনিসপত্র নিয়ে চলে এসেছি। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি সংসারে মিজানের কেনা কিছুই নেই। শুধু একটা চেয়ার সে কিনেছে তার বন্ধুর কাছ থেকে কারণ তার বন্ধু বলেছে এই চেয়ার মেরুদন্ডের জন্য উপকারী। এই মেরুদন্ডের জন্য উপকারী চেয়ার ছাড়া ওইবাসায় তার কিছুই নেই।
এমনকি তার জামা কাপড় ও হয় আমি কিনেছি নয় তার মা।
মিজানের উপর আমরা অসম্ভব বিরক্ত। তার মত অলস এবং বদ মেজাজী পুরুষ দ্বিতীয়টি নেই। বিয়ের দিন বধুবরণের পর আমার শাশুড়ি কাচুমাচু ভংগিতে বললেন,
" মা, একটা কথা বলি কিছু মনে করোনা। আমার ছেলের একটু প্রব্লেম আছে। "
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আমার খুব শখ আমার এক হালি বাচ্চা কাচ্চা থাকবে। ভয়ে ভয়ে বললাম,
" কি প্রব্লেম মা?? আপনি দাদী হতে পারবেন না?"
" আরেহ, কিসব বল!! অন্য রকম সমস্যা!"
" পাগল?"
" না তাও না"
" আলহামদুলিল্লাহ! বাকি সব ম্যানেজ করা যাবে"
" বউ! ছেলে আমার খুব অলস! আর বদমেজাজী।নিজের কাজ নিজে করেনা। অযথা চিল্লায়। ওরে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিছি, যাতে আমার উপর চাপ কমে"
" কি বলেন আম্মা! "
" হ্যা, আগেই বলা উচিত ছিল। নিজ স্বার্থে বলি নাই! এখন বিয়ে করাই দিছি। তোমরা তোমরা থাকবা! আমি আগামী মাসেই আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে ওল্ড হোমে চলে যাব৷ "
আম্মাকে এত বড় শান্তি আমি দিতে পারিনা।আমি বললাম,
" অসম্ভব, আপনাকে কিছুতেই ওল্ড হোমে যেতে দিব না"
ওল্ড হোমের ব্যাপারে আমার শাশুড়ির আগ্রহের কারণ হচ্ছে উনার ভার্সিটি লাইফের সব ফ্রেন্ড রা ওখানে থাকে। উনারা আবার ট্যুর করে বেড়ায়। আমার শাশুড়ি সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে এখন প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছেন। প্রচণ্ড পরিশ্রমী মানুষ। অল্প বয়সে স্বামী মারা যাবার পর এক হাতে ছেলেকে মানুষ করেছেন।
সেই ছেলে হয়েছে বদমেজাজি আর অলস। উদাহরণ দিলে বুঝবেন।জানি আপনাদের বিশ্বাস হবেনা। কিন্তু যার সাথে ঘটে সেই বোঝে।
একদিন রাতে মিজানের ফিরতে দেরি হয়ে গেলো। রাত দুইটা বাজে এসেই অফিসের কাপড়ে টিভি দেখা শুরু করল আর খাবার চাইল। আমার শাশুড়ি শুয়ে পরেছিলেন, হাঁক ডাকে উঠে আমাকে ইশারা করলেন।
" খবরদার মুক্তা! ওরে খাইতে দিবানা! আগে হাত মুখ ধুয়ে আসুক। এর পরে নিজে বেড়ে খাবে। আমাদের কে বেড়ে খাওয়ায়?"
আমি হ্যা হু বলে শাশুড়ি কে রুমে পাঠিয়ে, পতিপ্রেমে গদ গদ হয়ে মিজানের সামনে সোফার টেবিলে খাবার রেখে শুয়ে পরলাম।
ভোরে ফজরের নামাজ পড়তে উঠে দেখি, সে খেয়ে হাত না ধুয়ে ঘুমাচ্ছে। আমি ডাক দিলাম,
" এই উঠে হাত ধুয়ে ঘুমাও"
সে বিরাট একটা ঝাড়ি দিল আমাকে,
" হাত ধুব কেন? সকালের খাবার খাবোনা একটু পরে? একবারে হাত ধুব"
এই হল অবস্থা! এর পর সারাদিন অকারণে চিল্লাপাল্লা। আমার থেকেও আমার শাশুড়ি বেশি বিরক্ত মিজানের উপর। মিজান অফিস থেকে এসেই চা দাও, পানি দাও, গামছা দাও,লুংগি দাও করতে থাকে। আমার শাশুড়ি বিলাপ করেন,
" মৃত্যু দাও।এই অপদার্থের হাত থেকে মুক্তি দাও"
আমি নিজেও বিরক্ত। গোসল করে লুংগি ফেলে আসবে বাথরুমে, নিজের প্লেট ধোয়া তো দূর।একদিন পেপার পড়ার সময় আমাকে ডেকে বলে,
" মুক্তা, পেপারের পাতাটা উল্টাইয়া দিয়া যাও"
আমি হতভম্ব। আমি আমার শাশুড়িকে বললাম,
" আম্মা, আমাকেও আপনার সাথে বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে চলেন"
মা আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন এমন অপদার্থ ছেলে জন্ম দেবার জন্য।
সেইদিন রাতেই মাস্টার প্ল্যান হল যে আমি আর আমার শাশুড়ি আলাদা হয়ে যাব।
আজ আমরা চলে এসেছি। আজ মিজানের শিক্ষা হবে। আমরা ঠিক করেছি মিজান সঠিক পথে না আসা পর্যন্ত আমরা ফিরব না। তাকে নিজের কাজ করা এবং ভাল আচরণ শিখতেই হবে।
এখন রাত আটটা বাজে। এখনো মিজানের ফোন আসছেনা। আমি চিন্তিত। আমার শাশুড়ির অবশ্য ধারণা তার ছেলে অফিস থেকে ফেরার পথে সি এন জি তে ঘুমিয়ে পরেছে। এর আগে নাকি দুইবার এমন হয়েছে।কি জানি কি হয়েছে।
রাত দশ টায় পুরান বাসার কেয়ার টেকার কে ফোন দিয়ে জানলাম,
মিজান সাত টায় ফিরেছে। আর বের হয়নি অর্থাৎ বাড়িতেই আছে। কেয়ারটেকার কে বললাম খোঁজ নিতে।
দশ মিনিট পরে মিজানের ফোন। রিসিভ করেই লাউড স্পিকারে দিলাম।
" হ্যালো মিজান"
" না আপা, আমি কেয়ারটেকার বুলবুল"
" ও কি অবস্থা?"
" আপা,আমি আইসা দেখি দরজা খোলা,ভাইজান চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে। ডাক দিলাম। চোখ খুইলা বলল,
কে বুলবুল? ভালই হইছে আসছ! আমার প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বাইর কর। মুক্তারে একটা ফোন দেও। জিজ্ঞেস কর তারা কোথায়। বলে ঘুমাইয়া গেছে"
লিখা সংগৃহীত!