21/08/2023
১.
"তুই আমার খেয়ে, আমার পরে আমার সম্মানে কেন আঘাত করলি? সারাটা জীবন তোর জন্য খেটে গেলাম! তোর কি একটুও লজ্জা করে না?!
এই!! তুই কথা বলছিস না কেন!"
সুরাইয়া বরফের মতো স্থির হয়ে যায়। মায়ের চিৎকারের কোন জবাব দিতে পারে না। আরেকটু জড়োসড়ো হয়ে যায়। কচ্ছপের মতো নিজের খোলসের ভেতরে নিজেকে গুটিয়ে নেয় আরো একটু বেশি। মনে হচ্ছিল তার পায়ের তলার মাটিটা যদি ফাঁক হয়ে যেত তাহলে সে গর্তের ভেতর ঢুকে পড়তো।
"আমার খেয়ে, আমার পরে" আম্মুর এই কথাগুলো কানে ঘন্টার মত বেজে চলেছে। আহ সে একটা কত বড় বোঝা!! বিয়ে হচ্ছে না, ভালো কোন জায়গায় চান্স পাচ্ছে না -- আহ! সে যদি কোনভাবে দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যেত, তাহলে যেন সবার বোঝা হালকা হয়ে যেত! দু ফোটা চোখের পানি গড়িয়ে টপ করে হাতের তালুতে পড়ল।
আরশের মালিকের কাছে প্রত্যেকটা চিকচিক করা ফোঁটার হিসাব জমা পড়ে গেল।
২.
"তোর আর তোর পরিবারের জন্য আমি কি না করেছি?! আর কিছু না হোক তোকে তো মা-বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি পালছি! তোর পরিবারকে উঠিয়ে দিলাম তো আমি। আর তুই কিনা আমার সাথে মুখে মুখে কথা বলিস? আমার মতামতের উপরে তুই নিজের মতামত রাখার সাহস করিস?"
ছোট ভাই চয়ন তার চাচাতো ভাইয়ের কথা শুনে একদম ফাটা বেলুনের মতন চুপসে গেল। হ্যাঁ, আমার এই আত্মীয় ভাই তো আসলে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন! মা-বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই সে অসহায়, এতিম! ভাইয়ের উপকারকে সে কখনো অস্বীকার করে নি। এমনি কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে নিজের মতামতটা বলেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভীষণ ভুল হয়ে গেল! মনে হচ্ছে কেনই ভাইয়ের কাছ থেকে উপকার নিয়েছিল! কেনই বা কথাটা বলল!
চয়ন একদম চুপ। তাষর বুকের হৃদপিন্ডের ভেতর ভিশন গতিতে এসে বুলেট বিঁধে গিয়েছে। সেখান থেকে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জিহবার এই সাইলেন্ট বুলেটের আঘাতে তার হৃদয়টা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। সেই সাইলেন্ট বুলেটের শব্দ এবং অদৃশ্য রক্তক্ষরণ কেউ না দেখলেও, রব্বুল আলামিনের আদেশে কাঁধের ফেরেশতারা যত্ন করে টুকে রাখল।
৩.
"কি ব্যাপার তুমি না কত প্রাক্টিসিং? তুমি নাকি দুনিয়ার দ্বীনদার? এখানে ওখানে লেখালেখি করো? তোমার এই অবস্থা কেন? তোমার আচরণ এরকম কেন? এ কেমন প্রাক্টিসিং মুসলিম হয়েছ তুমি?"
কথাগুলো শুনে শামিমার মনে হচ্ছিল সে চিৎকার করে কাঁদবে। এতো জোরে চিৎকার করবে যে তার কন্ঠনালী ফেটে যাবে। কায়দা করে ঢোক গেলার সময় সে তার চিৎকার করার ইচ্ছাটা গিলে ফেলল।
একবার মনে হল যে বলে, "আসলে আমি আল্লাহর দ্বীন মানার চেষ্টা করছি দেখে নিখুঁত ফেরেশতা হয়ে যাইনি। আমার আদি পিতা বাবা আদম (আ) - তিনিও তো ভুল করে ফেলেছিলেন এবং ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন আলহামদুলিল্লাহ। আমি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকি, কিন্তু তাই বলে পারফেক্ট হয়ে যাইনি। ভুল আমারও হবে। আমাকে ক্ষমা করে দিবেন!"
শামিমার গলা দিয়ে কিছুই বের হলো না। খুব দম বন্ধ লাগছে, খোলা অক্সিজেনের মাঝে থেকেও নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। এরকম একটা কথা তার পুরো সপ্তাহকে বিষন্ন করে দিতে যথেষ্ট।
৪.
উপরের চিত্র গুলো খুব কমন। অহরহ আমাদের সামনে ঘটছে। আমরাই ঘটাচ্ছি। আমরা এগুলো নিয়ে একটু থেমে চিন্তা করিনা। এগুলোকে পাত্তা দেই না।
আমি যদি বলি আমরা সবাই একটা শক্তিশালী লোড করা বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি - বিশ্বাস করবেন? জিহবা আমাদের সেই বন্দুক। প্রতিনিয়তঃ নিঃশব্দে এই বন্দুক থেকে বের হওয়া বুলেট দিয়ে আমরা আমাদের কাছের মানুষদের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে যাচ্ছি।
প্লিজ কখনো আপনার সন্তানকে বলবেন না যে, "আমার খেয়ে, আমার পরে .."। এধরনের কথা সন্তানকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে। আপনার সন্তানের রিজিক আল্লাহর কাছে থেকে আসে। সে আপনার-আমার খায় না, আপনার পরেও না। আল্লাহ তার জন্য যতটুকু খাওয়া এবং পরা নির্ধারণ করে রেখেছে সেটা তার প্রাপ্য এবং সেটাই সে পায়।
দান করে অথবা কারো উপকার করে আমরা বুঝে না বুঝে তাকে খোঁটা দেই। মনে হয় আমি তো উপকার করলাম, কি মহান একটা কাজ করে ফেললাম, সে এখন আমার পায়ের নিচে থাকবে!! আসলেই কি তাই?
আল্লাহ অনুগ্রহ করে আপনাকে কিছু সম্পদ বেশি দিয়েছেন এই সম্পদ আপনার কাছে আমানত, এই সম্পদে গরিব-দুঃখীদের, মিসকিন আত্মীয়দের হক আছে। আপনি মানুষকে তার হকের মধ্যে যা ছিল সেটাই দিয়েছেন, এটা নিয়ে খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারে কুরআনে কঠোরভাবে মানা করা হয়েছে। মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাত করলে কেমন কষ্ট লাগে আমরা কি বুঝি না?
কারো সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট নিয়ে আঘাত করতে আমাদের পৈশাচিক আনন্দ লাগে। কেউ আল্লাহর খুশির জন্য দাওয়াতী কাজ করছে দেখে তার কাছ থেকে সব রকমের পারফেকশন আশা করবেন না। আদম (আ) নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে ফেলেছিলেন। প্রিয় নবী মুসা (আ) ভুলবশত একজনকে খুন করে ফেলেছিলেন। নবী ইউনুস (আ) তার কওমের প্রতি আশাহত হয়ে গিয়েছিলেন। তারা আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠতম রোল মডেল এবং তারাও দুর্বল মুহূর্তের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। ওই দুর্বল মুহূর্তেও তারা আল্লাহর দিকে ফিরেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে শক্তিশালী এবং সম্মানিত করেছেন। আমরাও যেন একজন আরেকজনের জন্য পজিটিভ শক্তি, সম্মান এবং আশা সঞ্চারের কারণ হই। উল্টোটা না।
কুরআন সম্পর্কে আমাদের মনে হয় এটা খুব উঁচু লেভেলের একটা ধর্মীয় এবং ইতিহাসের বই - যেখানে শুধু জটিল ব্যাপার গুলো বলা আছে। -অথচ আমাদের জীবনের এই ছোট ছোট দৈনন্দিন ব্যবহারের ব্যাপারে কুরআনে কত সুন্দর ভাবে গাইডলাইন দেয়া আছে। আমরা এগুলো মানি না, তাহলে আমাদের মনে শান্তি কিভাবে আসবে? আমাদের ঘরে রহমত কিভাবে আসবে?
"কারো উপকার করলে, সেটা তাকে মনে করিয়ে কষ্ট দিবে না ..." (কুরআন ২:২৬২)
"চিৎকার করবে না, কর্কশ ভাবে কথা বলবেনা, নম্রভাবে নিচু স্বরে কথা বলবে" (৩১:১৯)
"কাউকে নিয়ে উপহাস টিটকারি ব্যঙ্গ করবে না, অন্যকে নিন্দা করবে না, কারো মানহানি করবে না, কাউকে কোন বাজে নামে ডাকবে না .." (৪৯:১১)
"আল্লাহ যাদের বেশি দিয়েছেন, তাদের হিংসা করবে না.."
(৪:৫৪)
(কুরআনের আয়াতগুলোর ভাবানুবাদ করা হয়েছে।)
সংগ্রীহিত
আল্লাহপাক আমাদের বোঝার তউফিক দান করুন। আমিন