09/05/2026
ছোট বাচ্চাটা মাঝে মাঝেই মন খারাপ করে আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'সবার ছুটি হয় তোমার কেন কখনো ছুটি হয় না?'। প্রতি বারই উত্তরটাও একই দেই, তুমি জানো না? আমার জীবনটাই যে লম্বা একটা ছুটির দিন; মানুষ যখন খুশি নিয়ে তার পছন্দের কোন কাজ করে সে কাজ তাকে ছুটি কাটানোর মতোই আনন্দ দেয়!
কখনো ওর খুব পছন্দের কোন খাবার তৈরি করলে, তখনো বলতে থাকবে ও বড় হয়ে এ কাজ করবে, ও কাজ করবে, কিন্তু ও একজন শেফও হতে চায়। সাথে সাথেই আমার কন্ঠ পরিবর্তন হয়ে যায়😂, খাবার তৈরি করা তো অনেক কষ্টের কাজ, তুমি পারবে এতো কষ্ট করতে? উত্তরে বলে, 'তো কি হয়েছে, খাবারটা যখন তৈরি করা শেষ হবে তখন তো আমি অনেক বেশি আনন্দ পাবো! আমার যে একটু পর পরই ক্ষুধা লাগে আর খাবার শেষ হয়ে যায়, আবার বাহিরের খাবার খেলেও অসুস্থ হয়ে পড়ি, আমিতো ভালো ভালো খাবারও খেতে পারবো, তাইনা?' ঠিক তা-ই 😔
আবার মাঝে মাঝেই খুব চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে একই প্রশ্ন, 'আচ্ছা তুমি কি তাহলে তোমার ঐ শেফের কাছ থেকেই এতো কিছু রান্না শিখে গেলে? তাহলে আমাকেও নিয়ে চলো ঐ শেফের কাছে, আমিও শিখতে চাই😅।' উত্তরে বলি, আমার মূল কাজ তো বেকিং নিয়ে, অবশ্যই ঐ শেফের কাছ থেকে অনেক অনেক কিছু শিখেছি, বিশেষ করে খাবার তৈরির পেছনের সাইন্সটা, ভিন্ন ভিন্ন কুইজিন, তবে উনার কাছে গিয়ে জীবনে প্রথম বিশ্বাস করতে শুরু করেছি খাবার তৈরির এই শিল্পী হওয়ার জন্যই তার আগের সময় গুলোতে না জেনেই আমি এতো কাঠখড় পোড়াচ্ছিলাম; খাবার তৈরি করা শিখতে চাইলে তুমি এখন থেকেই একটু একটু করে স্টাডি করতে থাকো, বাকিটা পরে দেখা যাবে। তোমার বড় জনও স্কুলের খাতায় লিখেছিলো, বড় হয়েও পোকামাকড় গুলোর বন্ধু থাকতে চায়, আরো অনেক গুলো গাছ লাগাতে চায়, এ-কাজ সে-কাজ করতে চায়, আবার মায়ের মতো অনেক গুলো মানুষকে রান্না করেও খাওয়াতে চায়...!
যতো যুক্তিই দেই ওর হিসেব মেলেনা, ঠিক যেভাবে ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত আমিও হিসেব মেলাতে পারিনি- আম্মু কিভাবে এতো রান্না শিখলো! আবার খুব আশ্চর্য হই, কিভাবে ফরমালি না শিখেই অনেক গুলো রান্নার স্বাদ আমার হাতেও চলে আসলো! এমন অনেক খাবার আছে যেগুলো যতো পদ্ধতি ও উপকরণ পরিবর্তন করেই তৈরি করি না কেনো, স্বাদটা যেনো সেই মুখে লেগে থাকা পুরোনো স্বাদটার মতোই লাগে, মাঝে মাঝে মনও খারাপ হয় আমার এই ভেবে যে, তাহলে আমি কি করলাম! এই যে ছবি তে শেয়ার করা টক-মিষ্টি দইটা, খেয়ে কেউ বিশ্বাসই করবে না কতো সহজে খুব সাধারণ কয়েকটা উপকরণ ও পদ্ধতি অনুসরণ করে হাসতে খেলতে আমি এটা তৈরি করে ফেলি, আর প্রতিবারই অন্য সবার মতো নিজেই নিজেকে মনে মনে জিজ্ঞেস করতে থাকি, 'তুমি তৈরি করেছো? তুমি?😅'। না কোন প্রফেশনাল শেফের কাছ থেকে শিখেছি, না কাঁথা-কম্বলে ঢাকা, না ভাপে দেয়া, না ক্যারামেল, না কনডেন্স মিল্ক, না কার্নেশন মিল্ক, না ক্রিম, না দই মেকার, না অতিরিক্ত দই মেশানো, এমন কি হ্যান্ড হুইস্কটা পর্যন্ত ব্যবহার করি না এই দই তৈরি করতে...যারা দই তৈরি করেন বা দু'একবার তৈরির চেষ্টা করেছেন তারাই কেবল আবেগটা রিলেট করতে পারবেন, দেখতে দই হওয়া আর যেই-সেই পাত্রে বসিয়েও ভালো দোকানে ঠিক যেরকম দইটা খেতে হয় সেরকমটা তৈরি করতে পারার পার্থক্য ও খুশিটা!
জন্ম থেকেই আমরা মানুষেরা কিছু না কিছু প্রতিভা, বুদ্ধিমত্তা ও আবেগীও সংযুক্তি নিয়েই জন্মাই, বেঁচে ভালো থাকা ও রাখার জন্য! সমস্যাটা তখনই তৈরি হয় যখন আমরা সেটাকে গ্রহণ ও মূল্যায়ন না করে অন্য কিছুতে মনোযোগী হই বা হতে চাই, অথবা অন্যের স্বপ্ন যাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। প্রতিটা মানুষের অবকাঠামো একই রকম হলেও দেখতে যেমন আলাদা ঠিক তেমনি আমাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা, গুণাবলী, স্বপ্ন, পৃথিবীকে পরিবেশন করতে আসা পারপাস গুলোও...এমনও না যে সব প্রতিভা-ই আমাদের পেশা হতে হবে, সব খাবার বিক্রয় করেই আমাদের ব্যবসায় করতে হবে!
আকাশের মতো বিস্তৃত কাগজের ছোট্ট একটা খালি পাতা আর রঙ পেন্সিলের পরিবর্তে ফিক্সড করে দেয়া আমের ছবি পারফেক্টলি রঙ করতে শুরু করা থেকে সমাজ-সাফল্য নামক ছক বাঁধা পাল্লার মাপে আমরা কেবল নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ব্যস্ততাতেই একটা জীবন কাটিয়ে দেই, সত্যিই জীবনটাকে বাঁচি ক'জন?
পুতুল খেলার বয়স থেকেই আমি জানতাম, অনেক গুলো চেনা-অচেনা মানুষের ভালো থাকায় ও খুশিতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে হবে, শুধু জানতাম না পথটা কেমন হতে পারে! ঠিক যেভাবে একটার পর একটা প্রতিকূলতার বিপরীতে বছরের পর বছর হেল্প...হেল্প...হেল্প...যপতে যপতে আমরা নিজেরাই একটা হেল্প বা পথে রূপান্তরিত হয়ে যাই নিজের ও অন্যদের জন্যও!
ঘাস-ফুল-লতা-পাতার আবেগে যেকোন উদযাপনকে উৎসব মুখর করে তুলতে হেসে-খেলে খাবার তৈরি ও শেয়ার করা, খাবারের ব্যবসায়, খাবার তৈরি শেখানো, কিছু মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি, মুঠোয় রাখা উষ্ণতাটুকু দিয়ে কিছু মানুষ ও প্রাণকে ছায়া দেয়ার মতো, যান্ত্রিকতার এই যুগে হয়তো গুটি কয়েক মানুষকে তাদের আবেগীয় প্রকৃত সত্ত্বার সাথে পরিচয় ও সংযোগ করিয়ে দিতেও সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়ে এতো এতো কাঠখড় পুড়িয়েছেন...শব্দ থেকে পালাতে কয়েক বছর পারতপক্ষে খাতা-কলম স্পর্শ করিনি, অন্যান্য ডিভাইস, এমন কি বাটন মোবাইল ব্যবহার করেছি। আমিতো পাকাপোক্ত ব্যবসায়ী হবো বলে হিসাবনিকাশ পড়েছিলাম। বেড়ে ওঠা সময় গুলোতে মেয়ে মানুষ বলে ছেলেদের চেয়ে সম্মান-সুবিধা কোন কিছুই বেশি বৈ কম পাইনি...তাহলে কেনোই বা আমাকে যেতে হলো অমন অকল্পনীয়-অপ্রত্যাশিত-অবর্ণনীয়-অবিশ্বাস্য সব অভিজ্ঞতা গুলোর মাঝ দিয়ে?
সবাই তো আর অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে পায়ে মাড়িয়ে জীবন্ত পুঁতে ফেলার মতো আত্মবিশ্বাস, পাণ্ডিত্য আর বিজ্ঞ হয়ে জন্মায় না, কেউ কেউ নিশ্চয়ই আমার মতো কাদামাটি হয়েও জন্মায়, জন্মাবে...অন্য কারো মা হবে, বাবা হবে, নিজের চারপাশ ও পৃথিবীটাকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিতে চাইবে, নিবে...