14/08/2025
রাষ্ট্রের সীমানা চিরস্থায়ী নয়—এ সত্য ইতিহাসের পাতায় অগণিত উদাহরণে প্রমাণিত। সময়, রাজনীতি, অর্থনীতি, জনসংখ্যার পরিবর্তন, এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনের ফলেই রাষ্ট্রভূখণ্ডের মানচিত্র বদলাতে থাকে। একসময় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অধীনে বাংলা, বিহার, ওড়িষ্যা মিলিয়ে একটি সুবিশাল প্রদেশ ছিল। এ অঞ্চল শুধু ধান-গমের ক্ষেতেই সমৃদ্ধ ছিল না; মসলিন, নীলচাষ, রেশম, নৌপথ, এবং সাংস্কৃতিক জৌলুসে ভারতীয় উপমহাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে যায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। শুরু হয় দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন।
বাংলার মুসলিম কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণি ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। জমিদারি প্রথা, নীলচাষের জুলুম, এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া—সব মিলিয়ে গ্রামীণ দরিদ্র মুসলিম জনপদের জন্য জীবন ছিল অবহেলার আর দুর্দশার। এর বিপরীতে কলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজ প্রশাসনিক কাঠামোতে অগ্রগামী হয়ে যায়, যা রাজনৈতিক প্রভাবেও প্রতিফলিত হয়।
এ প্রেক্ষাপটে উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত মুসলিম সমাজে পুনর্জাগরণের চেষ্টায় আলীগড় আন্দোলন, মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯০৬), এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব—সবই এক নতুন রাজনৈতিক স্বপ্নের দিকে পথ দেখায়: মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য আলাদা রাষ্ট্র।
দীর্ঘ লড়াই, রাজনীতি, আন্দোলন, এবং অসংখ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, এই জনপদ আজাদি লাভ করে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে, যার নাম হয় “পূর্ব পাকিস্তান”। যে মানচিত্র তখন আঁকা হয়েছিল, সেটিই পরে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে দাঁড়ায়।
যে পিতা—রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে—দীর্ঘ সংগ্রাম করে স্বপ্নের পাকিস্তান গড়ে তুলেছিলেন, হয়তো তাঁরই সন্তান পরে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গড়ার জন্য, নতুন এক স্বপ্ন, নতুন সুখের প্রত্যাশায়। এই উত্থান-পতন, স্বপ্ন-ভঙ্গ ও নতুন স্বপ্নের পুনর্গঠন—সবই এই জনপদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ ছাড়া ১৯৭১ এর অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তেমনি ১৯৭১ ছাড়া ২০২৪ এর পথও খোলা থাকত না। ১৯৪৭ না হলে এ ভূখণ্ডের ভাগ্য হয়তো হতো কাশ্মীর, সিকিম কিংবা হায়দ্রাবাদের মতো—যেখানে জনগণ আজও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত, সংঘাত ও নিপীড়নের শিকার।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় ভারতীয় আধিপত্যবাদী (ইন্ডিয়ান হেজিমনি) প্রচারমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্য এমনভাবে মানুষের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে যে মনে হয়—১৯৭১-এর পূর্বে এই জনপদের কোনো ইতিহাসই ছিল না। অথচ সত্য হলো, এ ভূমির ইতিহাস হাজার বছরের; মৌর্য-গুপ্ত সাম্রাজ্য, পাল ও সেন যুগ, সুলতানি শাসন, মুঘল প্রশাসন, নবাবি আমল, ব্রিটিশ উপনিবেশ—সব মিলিয়ে আমরা বারবার রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গিয়েছি।
এ ইতিহাস বোঝা জরুরি—কারণ ইতিহাসকে খণ্ডিত করে দেখা মানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয়কেই দুর্বল করা। আমাদের জানা উচিত, সাতচল্লিশের স্বাধীনতা যেমন একাত্তরের ভিত্তি, তেমনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সাতচল্লিশের স্বপ্নের পুনর্নির্মাণ ও সংশোধন। ইতিহাসকে সঠিক প্রেক্ষাপটে দেখাই আমাদের স্বাধীন চেতনার পরিপূর্ণতা।